টিএসপিতে স্থায়ী সমাধানে অনীহা কেন

0
364

পাঁচ কারণে নগরীর পতেঙ্গার টিএসপি ( ট্রিপল সুপার ফসফেক ) কারখানার সালফিউরিক এসিড নির্গত হতে পারে বলে ধারণা করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা । এসব কারণকে সামনে নিয়ে তদন্ত করছেন এ সংক্রান্ত গঠিত কমিটি । যদিও শীত মৌসুমে কারখানার এসিড কিংবা গ্যাস নির্গত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে । এরপরও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে । কর্তৃপক্ষ সবসময়ই উৎপাদন কাজ সতর্কতার মধ্যে করার চেষ্টা করে থাকেন , এমন দাবি করলেও স্থানীয়রা বলছেন , শীত মৌসুমে গ্যাস বা এসিড নির্গমণ নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয় । তাদের । শীত ছাড়া অন্য সময়ে অবশ্য তেমন আতঙ্ক থাকে না । এদিকে , উৎপাদনের সময় কারখানায় জমে যাওয়া এসিডগুলাে বিশেষ চেম্বার বা প্ল্যান্টের মাধ্যমে নষ্ট করার নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠার সময় এমন প্ল্যান্ট টিএসপিতে স্থাপনই করা হয়নি । ৪৫ বছর পর বছর দুয়েক আগে নির্গত গ্যাস বা এসিড নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র স্ক্রাবার মেশিন বসানাে হলেও সেটির কার্যকারিতা নিয়েই এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে । স্ক্রাবার মেশিনটি সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা কিংবা মঙ্গলবার মধ্যরাতে গ্যাস লিকেজের সময় এসএস -২ প্ল্যান্টে কর্তব্যরতদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল- সেটি নিয়ে খােদ কারখানা কর্তৃপক্ষই সন্দেহের ঘােরে রয়েছেন । তবে কতৃ পক্ষ জোর দিয়েই বলছেন , কর্তব্যে কারাে গাফেলতি থাকুক কিংবা স্ক্রাবার প্ল্যান্টে সমস্যা থাকুক , তা চিহ্নিত করে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ।

কি ঘটেছিল সেদিন : গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল টিএসপি কারখানা এলাকা । পরবর্তীতে রাত দশটার দিকে বিদ্যুৎ আসা মাত্রই এসএস -২ প্ল্যান্টটি চালু করা হয় । এর কিছুক্ষণের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্ল্যান্টে জমে থাকা গ্যাস । সঙ্গে সঙ্গেই আশপাশের মানুষের মাঝে শ্বাস – প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয় । স্থানীয়রা জানান , রাত ১১ টার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে টিএসপি কারখানার আশপাশের মানুষগুলাে । শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা দেখা যায় । এরমধ্যে দশজনের অধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদেরকে হাসপাতালে পাঠানাে হয় । যদিও স্থানীয়দের অভিযােগ , প্রতি শীতেই এমন ঘটনা ঘটে । এজন্য তারা শীতকালে বেশি আতঙ্ক থাকেন । এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলার পরও কোন সুরাহা মিলেনি ।

কারখানা কর্তৃপক্ষ যা বলছেন : টিএসপি কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ( এমডি ) ইঞ্জিনিয়ার মাে . আতাউর রহমান বলেন , ঘটনার পরদিনই চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় । তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে । যদিও প্রাথমিকভাবে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেয়া হয়েছে । এরমধ্যে যখন প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছিল , ওই সময়ে স্ক্র্যাবার গ্যাসটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল কিনা , কিংবা কারও গাফেলতি আছে কিনা- সেটা খোঁজা হচ্ছে । যদিও এমন ঘটনা গত এক বছরে হয়নি । মূলত কুয়াশার কারণে এসব গ্যাস নিচে নেমে আসে । এছাড়া এটা সম্পূর্ণ কেমিক্যাল প্ল্যান্ট । এখানে সার্বক্ষণিক গ্যাস থাকেই । শতভাগও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না । ৪৭ বছরের পুরােনাে প্ল্যান্ট এটি । এরপরও সর্বোত্মক সতর্কতার সাথে কাজ করা হচ্ছে । তবে এ ঘটনার সাথে যদি কারও গাফেলতির প্রমাণ পাওয়া যায় , তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে । এছাড়া এমন ঘটনা যেন ভবিষতে না ঘটে । এজন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে , সেই প্রস্তাব দিতেও বলা হয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা ।

যে কারণে ছাড়তে হয় গ্যাস : কারখানাটিতে সার উৎপাদন করতে কয়েক ধাপে কাঁচামাল থেকে পণ্য উৎপাদন করে থাকে । কাঁচামাল সালফার থেকে সাফিউরিক এসিড তৈরির মাধ্যমেই সার উৎপাদন হয়ে থাকে কারখানাটিতে । প্রথম পর্যায়ে সালফার পুড়িয়ে তা সালফার ডাই – অক্সাইড হয় । এরপর ডাই – অক্সাইড থেকে ট্রাই অক্সাইড গ্যাস তৈরি হয় । এরপরই ট্রাই – অক্সাইড থেকে সালফার এসিডে রূপান্তর হয়ে থাকে । এ রূপান্তরের মাঝেই ট্রাই – অক্সাইড পানির সাথে মিশে । পুরােপুরি এসিডে রূপ নেয় । তবে কয়েকধাপের এই কাজটি করতে হলে প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়ােজন হয় । তাছাড়া প্ল্যাট নরমাল তাপমাত্রায় যদি কার্য সম্পন্ন করতে যায় , তাহলে ট্রাই অক্সাইড পুরােপুরি এসিডে পরিণত হয় না । এরমধ্যে যদিও প্ল্যান্ট ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে , তখন ঠান্ডা হয়ে যাওয়া প্ল্যান্ট চালু করলেও এসিড নির্গত হয় । আর প্ল্যান্ট চালুর সাথে সাথেই বাতাসের সঙ্গে এসিড ছড়িয়ে পড়ে । শুধু তাই নয় , পুরােনাে কৌশলে নির্গত গ্যাস বাতাসে ছাড়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট সময়কেও গুরুত্ব দিতে হয় । গতির কৌশল পরিবর্তন হলে এমন ঘটনা ঘটে থাকে বলেও জানান কারখানা সংশ্লিষ্টরা ।

যেসব কারণে হতে পারে : অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক দিয়ে প্ল্যান্ট পরিচালনা , গ্যাস বা এসিড নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র স্ক্র্যাবার মেশিন ঠিকঠাক মতাে কাজ না করা অথবা স্ক্র্যাবারের মধ্যে সঠিক সময়ে কেমিক্যাল না দেয়া , অপারেটরের গাফেলতি , বাতাসের গতি না বুঝে গ্যাস নির্গত করা এবং কুয়াশার কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ । এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কাজ চলবে বলে জানিয়েছেন কারখানাটির প্রধান কর্মকর্তা । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলেন , গেল ১৭ বছর আগে একযােগে পেপার মিলস , গ্লাস ফ্যাক্টরিসহ দেশের আটটি কারখানা পে – অফ করে দেয় তৎকালীন মন্ত্রণালয় । এতে কর্মরত শ্রমিক – কর্মচারীরা কোর্টে মামলা দায়ের করলে আদালত সকল শ্রমিকদের পুনরায় শিল্পমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অন্য কারখানাতে নিয়ােগ দিতে বলে ।

এরমধ্যে পতেঙ্গার টিএসপি কমপ্লেক্সে বর্তমানে এমন ৯২ জন শ্রমিক – কর্মচারী । কাজ করছেন যারা সার কারখানায় প্রশিক্ষিত নয় । এদের কয়েকজন ওইদিন রাতে আলােচ্য প্ল্যান্টটিতে ( এসএস -২ ) কর্মরত ছিলেন । অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত এসব কর্মীর কারণেই অনাকাক্সিক্ষতভাবে গ্যাস নির্গমণের ঘটনা ঘটেছিল কিনা , সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি টিএসপি’র এমডি মাে . আতাউর রহমান । তিনি বলেন , তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যা পাওয়া যাবে , সেই মােতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে । সূত্র – দৈনিক পূর্বকোণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here